বিদেশে উচ্চশিক্ষায় সহায়তা: শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেবে সরকার

বিদেশে পড়াশোনা করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট দূর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা মূলত ব্যাংক সলভেন্সি বা আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে ভর্তি হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় ব্যাংক গ্যারান্টি বা সলভেন্সি দেখাতে না পারায় নানা জটিলতায় পড়েন। এই সমস্যা সমাধান করতেই সরকারের এই উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়ে।

তিনি আরও জানান, এই ঋণ সরাসরি নগদ অর্থ হিসেবে শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হবে না। বরং টিউশন ফি, ভিসা-সংক্রান্ত খরচ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি পরিশোধের সুবিধা থাকবে। ফলে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং অপব্যবহারের সুযোগ কমবে।

ঋণ সুবিধাটি প্রদান করবে সরকারের বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’। এই ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর অগ্রগতি পর্যালোচনায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হচ্ছে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ। অনেক সময় ভিসা প্রক্রিয়ায় ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা সলভেন্সি দেখাতে না পারায় যোগ্য প্রার্থীরাও সুযোগ হারান। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই বাধা অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে স্বল্পমেয়াদে কিছু প্রভাব পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বা রেমিট্যান্সে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অভিবাসন ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকার ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে, যার আওতায় বিভিন্ন দেশে যাওয়ার খরচ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। এতে করে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমবে এবং সাধারণ মানুষ নির্ধারিত খরচেই বিদেশ যেতে পারবে।

মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাবে।

জাপানে জনশক্তি পাঠানোর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নিতে ‘জাপান সেল’ গঠন করা হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিসা পেতে যেসব ক্ষেত্রে ভারত যেতে হয়, সেই নির্ভরতা কমাতে ঢাকাতেই কনস্যুলার সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে এই সেবা প্রদান শুরু করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সাম্প্রতিক ভ্রমণ-সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়েও সরকার সক্রিয় রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কারিগরি সমস্যার কারণে ফ্লাইট চলাচলে যে বিঘ্ন ঘটেছিল, তা দ্রুত সমাধানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম জনগণের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর সক্রিয়তা বাড়ানো হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই এসব তথ্য জানতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ঋণ সুবিধা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণই সহজ হবে না, বরং ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।