সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে সরকার একযোগে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন আনতে সরকার বহুমাত্রিক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।
রাজধানীর সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি। এ সময় প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সচিব মাহবুবা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী জানান, সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের নারী প্রধানদের অন্তর্ভুক্ত করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে এবং তারা মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। ধাপে ধাপে এই সুবিধা সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।
ধর্মীয় সেবাদানকারীদের জন্যও সরকার নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও গির্জার যাজকদের জন্য সম্মানী ভাতা চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে হাজারো ধর্মীয় সেবক এই সুবিধার আওতায় এসেছেন এবং আগামী কয়েক বছরে এটি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে পোশাক ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে যাকাত ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষিখাতে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন তিনি। আগামী পহেলা বৈশাখ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৮টি বিভাগের ১১টি উপজেলায় ২১ হাজারের বেশি কৃষকের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হবে। এছাড়া সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার কাজ ইতোমধ্যে ৫৪টি জেলায় শুরু হয়েছে।
সরকারি ব্যয়ে সংযমের উদাহরণ তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্যরা ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি ভিআইপি প্রোটোকল হ্রাস এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ থাকলেও আপাতত জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। এ সময় জনগণকে গুজব থেকে দূরে থাকা এবং অযথা পণ্য মজুত না করার আহ্বান জানান তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নীতিগত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিনিয়োগ ফেরত নিতে আগাম অনুমতির বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
শ্রমখাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঈদের আগে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে শিল্পাঞ্চলে কোনো অস্থিরতা তৈরি হয়নি।
স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল সেবা বাড়াতে ই-হেলথ কার্ড চালু এবং এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এর মধ্যে অধিকাংশই নারী হবেন। পাশাপাশি ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে চাঁদাবাজি দমন ও নারীদের নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নারী যাত্রীদের জন্য ‘পিঙ্ক বাস’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
ক্রীড়াকে পেশাগতভাবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ক্রীড়া শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ মওকুফ, প্রবাসী কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন প্রণয়ন, বিমানবন্দরে বিনামূল্যে ওয়াইফাই চালু এবং বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের উদ্যোগের কথাও ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে তথ্যমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের এই সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে।
