চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনায় হামলাকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। রোববার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আহত সাংবাদিকদের দেখতে গিয়ে তিনি এই দাবি জানান।
এদিকে, এই হামলায় নিন্দা জানিয়ে এবং সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার না করলে কঠোর কর্মসূচি নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)। একই দিনে চট্টগ্রাম টেলিভিশন রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক (সিটিআরএন) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীরা একটি অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিক হোসাইন জিয়াদ ব্রেইনে আঘাত পেয়েছেন এবং নিউরো সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। অন্য সাংবাদিক মো. পারভেজও আহত হয়েছেন এবং তার মাথায় স্টিচ দেওয়া হয়েছে। আমরা যেসব সন্ত্রাসীর নাম শুনছি, তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাসীদের কোনো দল, নাম, ধর্ম বা বর্ণ নেই; তারা সন্ত্রাসী এবং তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে আমি স্পষ্টভাবে বলছি, আমরা একটি নিরাপদ নগরী চাই। এখানে সন্ত্রাসীদের জন্য কোনো স্থান নেই। প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। যারা রাজনৈতিক যোগসূত্রে এদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদেরও রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার করা হোক। যদি আমার দলের কারো সংশ্লিষ্টতা থাকে, তাদেরকেও বহিষ্কার করার দাবি জানাচ্ছি।”
রোববার সকালে জঙ্গল সলিমপুরের লোহারপুল এলাকায় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হোসাইন জিয়াদ ও ক্যামেরাম্যান মো. পারভেজ। টিভির প্রতিবেদক ফয়সাল করিম জানান, “সংবাদ সংগ্রহের সময় হঠাৎ ৫০–৬০ জন লোক তাদের ওপর হামলা চালায়। তারা দেশীয় অস্ত্র ও গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে, অটোরিকশাতেও হামলা চালায়। সাংবাদিকদের মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনতাই করা হয় এবং ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়।”
এর আগে শনিবার ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি ঘটে। এক রোকন বাহিনীর সদস্য গুলিতে নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন।
দুই সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ এক বিবৃতিতে বলেন, “সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা শুধু ঘৃণ্য নয়, ন্যক্কারজনক এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশ্রয় পাওয়া এসব সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ঘটনা দুঃখজনক ও নেতাদের ব্যর্থতার প্রমাণ।”
সিইউজে নেতৃবৃন্দ ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই সাংবাদিকের ওপর হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।”
বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে সিটিআরএন আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের উপর হামলা ‘গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা’ ছাড়া কিছুই নয়। তারা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, অতীতেও প্রশাসন জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হয়েছেন। তারা বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে, ‘একটি প্রভাবশালী চক্র’ সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে সত্য প্রকাশ ঠেকাতে চায়।
সমাবেশে বক্তৃতা দেন সাংবাদিকরা মো. শাহনেওয়াজ, ম সামসুল ইসলাম, চৌধুরী ফরিদ, গোলাম মাওলা মুরাদ, শাহনেওয়াজ রিটন, আলমগীর সবুজ, তৌহিদুল ইসলাম, আলিউর রহমান, ফখরুল ইসলাম, হাজেরা শিউলি, এমদাদুল হক, সৈয়দ তাম্মিম মাহমুদ ও শফিক আহমদ সাজিব। সংগঠনের সদস্য আরিচ আহমদের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক একে আজাদের সঞ্চালনায় সমাবেশ পরিচালিত হয়।
