গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী জানিয়েছেন, দীর্ঘ সাত বছর তিনি এসিবিহীন একটি সংকীর্ণ কক্ষে আটক ছিলেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পরই কেবল তাকে এসি-সংবলিত কক্ষে নেওয়া হয়। আসামিপক্ষের জেরায় তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যের বেঞ্চে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তিন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে জেরা পরিচালনা করেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদী, মঈনুল করিম এবং আবদুস সাত্তার পালোয়ান। এই মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন আমান আযমী। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি তার টানা দুই দিনের জবানবন্দি শেষ হয়।
জেরার একপর্যায়ে নিজের বন্দিজীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আমান আযমী বলেন, ‘২০২৩ সালের ৬ জুন আমি প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিলাম। তখন চিকিৎসকের পরামর্শে কক্ষে এসি লাগানো হয়। এর আগে প্রায় সাত বছর এসিবিহীন অবস্থায় একটি ছোট কক্ষে ছিলাম। তারা আমাকে বলত—আপনাকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’
তিনি আরও জানান, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাতে রাজধানীর বড় মগবাজারে নিজ বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় নিখোঁজ রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি গুম অবস্থায় ছিলেন বলে দাবি করেন।
চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে জেরায় তিনি বলেন, চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করেছিলেন। ডিভিশন বেঞ্চ থেকে রুল জারি হলেও পরে একক বেঞ্চে শুনানি শেষে তা খারিজ হয়ে যায়। তিনি আরও জানান, বরখাস্তের আদেশে সেনাপ্রধানের ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি স্বাক্ষর করেছিলেন, তবে পরবর্তী আদেশে কে স্বাক্ষর করেছেন তা তার মনে নেই।
গুম থেকে মুক্তির পর কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে ওই জবানবন্দি দেন বলে উল্লেখ করেন। তবে সেই তদন্তে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা তার জানা নেই। এছাড়া গুমের ঘটনায় কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পাননি বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিন আসামিপক্ষের আইনজীবী তার জেরা অসমাপ্ত রেখে আরও সময়ের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে পরবর্তী জেরার জন্য আগামী ২১ এপ্রিল দিন ধার্য করেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন, যাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে তিনজন গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং তাদের ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেল থেকে আদালতে হাজির করা হয়। গ্রেপ্তার সেনা কর্মকর্তারা হলেন—ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
অন্যদিকে পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক একাধিক ডিজিএফআই মহাপরিচালকসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা। মামলাটি গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে হওয়ায় এর অগ্রগতি নিয়ে আইন অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
